সর্বনাশা পরকীয়া

জীবনযাপন

স্বামীকে খুন-গুম করছেন স্ত্রী, কোথাও স্ত্রীকে স্বামী। মায়ের প্রেমিককে দশ টুকরো করে নদীতে ফেলেছেন পুত্র। ক্ষোভে-অপমানে গলায় দড়ি দিচ্ছেন কেউ। কেউ আবার সবকিছু জেনেই সামাজিক মর্যদা আর সংসার টিকিয়ে রাখতে নীরব থাকছেন। এসবের মূলেই রয়েছে পরকীয়া। দাম্পত্য সম্পর্কগুলোকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে এই অনৈতিক সম্পর্ক। উচ্চ বিত্ত থেকে শুরু করে দরিদ্র পরিবারেও আঘাত হানছে সর্বনাশা পরকীয়া। চট্টগ্রাম নগরীতে দিনে গড়ে সংসার ভাঙছে ১৪টি। এর বিরাট একটি অংশের নেপথ্যে রয়েছে পরকীয়া।

বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের মতো রক্ষণশীল সমাজে এমন অনৈতিকতা ভাবিয়ে তুলেছে সচেতন মহলকে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মূলত ইসলামি শিক্ষার অভাব ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে এমন হচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এবং আকাশ সংস্কৃতিও এজন্য দায়ী। অনৈতিক সম্পর্কের ফলে পরিবার ও সমাজে কলহ-বিরোধ বাড়ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে পিতামাতার পরকীয়া সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষন্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয়।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে পরকীয়ার জেরে প্রায় খুনের ঘটনা ঘটছে। শুক্রবার রাতে নগরীর হালিশহর থানার ছোটপুল থেকে বস্তাবন্দি এক তরুনীর মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় এই খুনের নেপথ্যে রয়েছে পরকীয়া। নিহত তরুণীর নাম সুমি ইসলাম। তার স্বামী জাহিদ হোসেন রাজু (২৮) খুনের দায় স্বীকার করে বলেছেন সুমির পরকীয়া ছিল। এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডে তাকে সহযোগিতার করার অভিযোগে পুলিশ তার বন্ধু আবদুল জলিল ও তার স্ত্রী ফেরদৌসী বেগমকে গ্রেফতার করে।

গতকাল (সোমবার) রাজুর দেখানে মতো নগরীর আগ্রাবাদ বেপারী পাড়ার পইট্টাদীঘির পাড়ের কবরস্থান থেকে সুমির খন্ডিত মস্তক উদ্ধার করে পুলিশ। সুমি ইসলাম খুলনার টুটপাড়া এলাকার শহিদুল ইসলামের মেয়ে। স্বামী জাহিদ হোসেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা এলাকার হারুনুর রশিদের ছেলে। গত দেড় বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। সুমি সিডিএ আবাসিক এলাকায় একটি বুটিক হাউজে চাকরি করতেন। তারা ছোটপুল এলাকায় ভাড়া থাকতেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, আলোচিত এই মামলার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। গ্রেফতারে পর জাহিদ হোসেন রাজু হত্যাকান্ডের দায় শিকার করে জড়িত অন্যদের নামও বলেছে। খুব দ্রুত সময়ে মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জাহিদ দাবি করেছে, পরকীয়া থেকে দাম্পত্য কলহে এ হত্যাকান্ড। বিয়ের পর থেকে সুমির সঙ্গে জাহিদের বনিবনা হচ্ছিল না। বিভিন্ন জনের সঙ্গে সুমির মেলামেশা নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া হতো। নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এধরনের অপরাধ বাড়ছে বলেও জানান সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার।

এর আগেও নগরীতে পরকীয়ার জেরে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। নগরীর ফিরিঙ্গি বাজারে নিজের খালুর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের জেরে স্ত্রী আসমা ও খালু মাকসুদকে হত্যা করে প্রবাস ফেরত রফিকুল ইসলাম হৃদয়। বিয়ের পর বিদেশ চলে যান হৃদয়। তিন বছর পর দেশে ফিরে এই সম্পর্কের কথা জানতে পেরে স্ত্রীকে গলাটিপে আর খালুকে দোকানে ডুকে কুপিয়ে হত্যা করেন হৃদয়।

ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বালিশ চাপা দিয়ে স্ত্রী শাহানা খুন করে তার স্বামী সেলিমকে। পরে প্রেমিকের সহযোগিতায় লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। সীতাকুন্ডের এই ঘটনায় শাহানার প্রেমিক রাসেলকে গ্রেফতারের পর সেলিমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

‘সাগর কণ্যা’ নামে লাইটার জাহাজের মাস্টার মহসিনকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে তার লাশ দশ টুকরা করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে নিশ্চিত হয় এই খুনের নেপথ্যে ছিল পরকীয়া। মায়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি কিশোর আরিফ হোসেন (১৯)। এ কারণে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী নাবিক মোহাম্মদ মহসিনকে (৫১) খুন করে সে। পরে করাত দিয়ে লাশ দশ টুকরা করে ক্ষোভ মেটায় ওই কিশোর। প্রতিনিয়তই এমন খুনের ঘটনা ঘটছে পরকীয়ার জেরে। খুনের পাশপাাশি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।

পরকীয়ায় ব্যাপক হারে সংসার ভাঙছে। সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে নগরীতে গত বছর বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে সালিশি আদালতে আবেদন করেন ৪ হাজার ৯শ’ ৭০ জন। অর্থাৎ, দিনে গড়ে ১৪টি সংসার ভাঙছে। আবেদনকারীদের অধিকাংশই নারী। বেশ কয়েকটি কারণে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। তবে এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পরকীয়ার জেরে সংসারে অশান্তি। সালিশ আদালতে আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছেলেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পর পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, সংসারে মানিয়ে না চলা, স্বামীর কথা না শোনা। আর মেয়েদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে যৌতুকের জন্য নির্যাতন, অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক বা দ্বিতীয় বিয়ে, স্বামীর মাদকাসক্তি।

সিটি কর্পোরেশনের রেকর্ড বলছে, বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইনি সহযোগিতা দিতে কাজ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।

ব্লাস্ট চট্টগ্রামের স্টাফ লইয়ার মিসকাতুত তানজিমা আজিম দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ব্লাস্টের কাছে যেসব ঘটনা আসছে তার মধ্যে পারিবারিক বিরোধের প্রধান কারণ মাদকাসক্তি, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পরকীয়া। প্রায় সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে পরকীয়া সংসার ভাঙ্গার প্রবণতা বাড়ছে। জানা যায়, এমন অনেক পরিবার রয়েছে যারা লোকলজ্জা এবং সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টি জেনেও নিরবে সহ্য করে চলেছেন। এসব পরিবারে নিয়মিতই ঝগড়া বিবাদ লেগে আছে। এর প্রভাব পড়ছে সন্তানদের উপর।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুশাসন মেনে না চলায় নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। আর এ কারণে সমাজে পরকীয়ার মতো অনৈতিক সম্পর্ক বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে এ ধরনের অনৈতিকতার বিস্তার ঘটছে। আকাশ সংস্কৃতিও এজন্য দায়ী। অনৈতিক সম্পর্কের কারণে পরিবারে যে অশান্তি তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রথমত সন্তানদের উপর। তারা হতাশায় ভুগছে। আর এ হতাশা থেকে তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।