মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের উপর হামলা, সন্দেহে যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ান

সারাদেশ

ফেইসবুকে ত্রাণ নিয়ে ষ্ট্যাটাস দেয়ায় আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মোঃ ওমরের (২৯) উপর হামলা করে একদল সন্ত্রাসী। সে বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমানের সন্তান।

পরে পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সহায়তায় গুরুতর আহত অবস্থায় ওমরকে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ভর্তি করায়।

ফেনী জেলা যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ানের নির্দেশে হামলা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ আজিজ জানান, মোঃ ওমর সকাল হাসপাতালে আসলে আমরা তার শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাই। তাকে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি দিয়েছি। রোগীর শারীরিক অবস্থা দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আহত ওমর (২৯) বলেন, মাননীয় সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী ফেনীর অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ দিয়েছেন। কিছু স্থানীয় নেতা ওনার এই ত্রাণ সামগ্রী সঠিকভাবে বন্টন না করে শুধুমাত্র নিজেদের পছন্দের লোকজনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে। প্রকৃত অসহায় মানুষরা বঞ্চিত হচ্ছে ত্রাণ প্রাপ্তি থেকে। প্রতিবন্ধী জয়নাল ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় আমি তা ফেসবুকে তুলে ধরে ঐ প্রতিবন্ধীর জন্য সাহায্যের জন্য পোষ্ট করি। আমার ফেইসবুকের পোষ্ট দেখে পৌর যুবলীগ নেতা রফিক ভাইসহ অনেকে প্রতিবন্ধী জয়নালকে ত্রাণ ও নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন।

ওমর আরো বলেন, আমার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে ক্ষিপ্ত হয়ে যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ানের অনুসারীরা আজ সকালে আমাকে ডেকে নেয়। স্থানীয় মুরব্বিদের উপস্থিতিতে আমাকে ফেসবুকের পোষ্টের কথা জিজ্ঞেস করে। কথা বলার এক পর্যায়ে আবু সুফিয়ানের অনুসারী আলমগীর, রাজু, রাজন, হানিফ, আকবর, ইসমাইল, আজাদ , আরাফাত, ডিস মানিক সহ ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী আমার উপর অতর্কিত হামলা করে। আমি প্রাণভয়ে ওদের হাত থেকে ছুটে আমার দোকানে এসে বাঁচার চেষ্টা করি পরে তারা আমার দোকানে এসেও ভাঙচুর ও লুটপাট করে আমাকে মারাত্মকভাবে জখম করে। ওমর বলেন, তাৎক্ষণিক ফেনী মডেল থানায় কল করে সাহায্য চাইলে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে ফেনী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) সাজেদুল ইসলাম জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আহতের বাবাকে ও আত্মীয়কে থানায় অভিযোগ দায়েরের জন্য বলা হয়েছে। এখন (রাত ৯ টা) পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেনি।

আহত ওমরের পিতা অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমান কান্না জড়িত কন্ঠে দৈনিক ফেনী.কম প্রতিবেদককে বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। জীবন বাজি রেখে যে দেশ আমরা স্বাধীন করেছি সেই দেশেই দিনে দুপুরে আমার পরিবারের উপর হামলা করেছে সন্ত্রাসীরা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার সন্তানের উপর হামলার ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবি করছি।

তিনি বলেন, গতকাল কয়েকজন যুবক আমার ছেলে মোঃ ওমর কে দোকানে খোঁজ করতে আসে। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, আমার ছেলে আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে আপত্তিকর লেখা লিখেছে তাই তারা আমার ছেলেকে মারার জন্য খুঁজছে। তারা আমাকে শাসিয়ে যায় আগামী কালকের মধ্যে ছেলেকে তাদের কাছে না নিয়ে গেলে আমার ছেলের বড় ধরণের ক্ষতি হয়ে যাবে।

ছিদ্দিকুর রহমান আরো বলেন, ছেলের জীবনের কথা চিন্তা করে আমি রাতেই আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে ছেলের ফেসবুকের লেখালেখির জন্য ক্ষমা চাই, আবু সুফিয়ান আমাকে বলে এলাকার ছেলেপেলেরা ক্ষেপে গেছে। তবে আপনি সন্মানী মানুষ আমি সকালে বসে এটার সমাধান করে দিবো। অথচ আজ সকালে আমার ছেলেকে ডেকে নিয়ে তারা মারাত্মকভাবে আহত করে। আমাকে ও আমার ছোট ছেলেকেও লাঞ্ছিত করে।

আহত ওমরের ছোট ভাই আনসার সদস্য ওসমান গণি বলেন, সকাল বেলায় ভাইয়াকে তারা ডেকে নিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ওরা ভাইয়ার উপর চড়াও হয়। ভাইয়ার দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করে ভাইয়াকে মারাত্মকভাবে পিটিয়েছে। সন্ত্রাসীরা স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাধর। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মানিক বলেন, হামলার ঘটনা আমি পরে জানতে পেরেছি তবে কে বা কারা হামলা করেছে তা এখনো জানি না। তিনি বলেন, হামলাকারী যেই হোক তার কঠোর বিচার হতে হবে।

হামলার ঘটনার বিষয়ে জানতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাহাব উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জেলা যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ানের কয়েকজন অনুসারী অভিযোগ করে ওমর ফেসবুকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে অপপ্রচার করছে। আজ সকালে এ বিষয় নিয়ে আমরা বৈঠকে বসি। আমার সভাপতিত্বে বৈঠকে ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ বর্তমান সভাপতি বেলাল হোসেন, ফয়েজ, ডিস মানিকসহ এলাকার গণমাণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ঘটনার এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ উত্তেজিত হয়ে তর্কাতর্কি থেকে মারামারিতে রূপ নেয়। ওমর হামলার শিকার হয়। হামলাকারীরা আমাদের কথা না শুনলে আমরা শালিস বৈঠক থেকে উঠে চলে যাই।

কারা হামলা করেছে জানতে চাইলে সাহাব উদ্দিন এড়িয়ে যান।

হামলার ঘটনায় উপস্থিত ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি বেলাল হোসেন বলেন, বৈঠকে আমাদের কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ করে কিছু যুবক ওমরের উপর হামলা করে। তাদের মারমুখী আচরণ দেখে আমরা সরে যাই। পরে পুলিশ এসে ওমরকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হামলাকারীরা কারা জানতে চাইলে বেলাল হোসেন জানাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

জেলা যুবলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আবু সুফিয়ানের কাছে মুঠোফোনে হামলার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এলাকার কিছু গরীব অসহায় মানুষদের ত্রাণ বিতরণ করেছি। ওমর সেটাকে বিতর্কিত করার জন্য আমার নামে ফেসবুকে বিভিন্ন প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো শুরু করে। সে বলে বেড়াচ্ছে আমি সরকারি ত্রাণ মেরে খাচ্ছি এবং জননেতা নিজাম উদ্দিন হাজারী দেয়া ত্রাণ নিজের নামে বিতরণ করছি যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং আমার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র।

আবু সুফিয়ান আরো বলেন, জননেতা নিজাম উদ্দিন হাজারীর নির্দেশনায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটা গোষ্ঠী তাকে দিয়ে এ ধরনের অপপ্রচার করছে।

তিনি বলেন, এলাকার লোকজন তার অপপ্রচার দেখে আমার কাছে আসে এবং আজ বিকাল ৪টায় তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। ঘটনার পরে শুনতে পাই, ওমরের পরিবার স্থানীয় লোকজন নিয়ে আজ সকালেই বৈঠকে বসেছিলো এবং সেখানে অল্পস্বল্প কথা-কাটাকাটি হয়।
ওমরের দোকানে কে হামলা করেছিল জানতে চাইলে, দোকানে ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান সুফিয়ান। তিনি বলেন, নিয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

ওমরের উপর হামলাকারীরা আপনার লোক কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আবু সুফিয়ান বলেন, এলাকার সব মানুষই আমার পরিচিত সেক্ষেত্রে আমি সবাইকে চিনি। এখানে আমার লোক বলতে কিছু নেই।

বৃহস্পতিবার রাতে মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমানের সাথে কথা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে সুফিয়ান বলেন, মুরব্বি আমার কাছে এসেছিলেন। আমি বলেছি আমরা সবাই বসে এটা মিলমিশ করে দেবো। কিন্ত সকালে বসার ব্যাপারটা আমি জানতাম না, ঘটনার পরবর্তীতে জেনেছি।

যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ান বড় পদে থাকলেও তার অতীত নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানালেন চমকপ্রদ তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেন, আবু সুফিয়ান একসময় জামাত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। সে দীর্ঘ বছর জামায়াতের প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইন্সুরেন্সে চাকরী করত। পরে সে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয় এবং ছাত্র সমাজ করত। কয়েক বছর আগে সে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে যুবলীগের রাজনীতি করছে।