মা দিবসের সেরা লেখা লিখেছেন ড. নয়ন বাঙ্গালী

জাতীয়

এবার মা দিবসে সেরা লেখা জরিপে প্রথম হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অাইনজীবি, অান্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী, নির্বাসিত সমাজকর্ম বিশ্লেষক গোলাম মুহাম্মদ রাব্বানী (নয়ন বাঙ্গাল) ।

মা দিবসে তিনি তার ভেরিফাইড অাইডিতে অাবেগঘন এক স্ট্যাটাস দেন। এতে অনেক পাঠক অাবেগে অাপ্লুত হয়ে পড়েন। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অালোকিত ঢাকা পরিবার। তাই এবার মা দিবসে ড. নয়ন বাঙ্গালীর লেখাটি সেরা লেখা হিসেবে মনোনীত করেন বিচারক মন্ডলীরা।

নিচে ড. নয়ন বাঙ্গালীর লেখাটি হুবহু পাঠকের উদ্দেশ্যেে তুলে ধরা হলঃ

মা দিবস উদযাপিত হউক মায়েদের স্বপ্ন পূরনের শুভ বার্তায়
—————————————————————-
-নয়ন বাংগালী

মা রা শুধু সন্তানেরই স্বপ্ন গড়ে না, সন্তানেরও উচিত মায়েদের কিছু জীবন উন্নয়নের স্বপ্নে শরীক হওয়া, কিছু উৎসাহ দেয়া, অনুপ্রেরনা জোগানো এবং পারলে সেই স্বপ্ন চূড়ায় উঠার পাহাড়ে হাত ধরে ধরে উঠতে সহায়তা করা।

তবে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী ধরেই নিয়েছে যে শুধু মায়ের একমাত্র দায়িত্ব সন্তান জন্মদিবে, তারপর তাকে লালন পালন করে বড় করবে, তার প্রাপ্ত বয়সে পৌছানো পর্যন্ত জীবনের সব স্বপ্ন পূরনে একটানা খেটে যাবে, হাত তুলে মোনাজাত ধরে বসে থাকবে – হ্যা মা রা তাই করে, করেও আসছে জনম জনম ধরে।

কিন্তু একটি মায়ের ওতো নিজস্ব কিছু চাওয়া পাওয়া বা স্বপ্ন থাকে যা একান্ত তার নিজেকে নিয়ে এবং তা অপূর্নও থেকে যায় যা বলার সাহসও তার হয় না, তাছাড়া স্বপ্নগুলো পূরণের সময়ও তার হয় না।

আমি জীবন চলার পথে অনেক দেখেছি যে সন্তান মাকে বলছে, আরে মা তোমার কি আর সেই বয়স আছে এগুলো করার, ওটা খাওয়ার বা, ওখানে যাওয়ার – এখন তোমার বয়স হয়েছে মা, ঘরে থাকো, নামাজ পড়ো, আল্লাহ কে ডাকো। মা-ও ভাবে সন্তান ঠিকই বলেছে হয়তো। মাও বলে তখন, যা বাবা তোরা ঘুরে আয়, সাবধানে গাড়ী চালা, তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে আয়। দোয়া করতেই থাকে সন্তানের জন্য, ভুলেই যায় নিজের স্বপ্ন গুলো যে আছাড় খেয়ে পড়ে মারা গেলো একটু আগে।

ঘর ভর্তি খাবার, বিলাস বহুল বাড়ী সবই হয়তো আছে সাজানো; কিন্তু ছোটো ছোটো চাওয়া গুলো স্বপ্ন গুলো বললে আর হয়তো কেউ শুনবে না তাই তিনি আর কাউকে বলবেনই না।

আমার এক বন্ধুর মা কে দেখেছি বৃদ্ধ বয়সে উনার আইন পড়তে মন চাইলো। অমনি বন্ধু ও তার ভাইবোন মহা নাখোশ ; বলে উঠলো এগুলো ফর নাথিং ভাবনা, কি হবে মা ? এসবের বয়স আছে ? বাদ দাও বাসায় থাকো। তার মনের কষ্ট টুকু আমি দেখতে পেয়েছিলাম কিন্তু আমার কিছুই করার ছিলো না।

মায়েদের শেষ বয়সে সমাজে কিছু একটা হতে চাওয়া কি অপরাধ?
আমার মা কে আমার কোনো ভাইবোন রাজনীতি করতে দিতে চায় নাই – ওরা মহা বিরক্ত ছিলো বিষয়টি নিয়ে। ছোটো ভাই কে দেখতাম সারাদিনই মহা ক্ষোভে থাকতো। কেনো মা বাইরে বাইরে, কেনো ঘুরে বেড়ান সারাদিন, কেনো মিটিং মিছিল করেন; কেনো বিচার শালিস নিয়ে ব্যস্ত – এমনকি কেনো এতো মানুষ বাসায় আসে?
এগুলো আম্মার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিক্কার কষ্টের অধ্যায়। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার মা তার ছোট্ট গন্ডির মধ্যে একটু উৎসাহ পেলেই সফল হবে। আর এটাও জানতাম আম্মা যদি সফল হয় তাহলে ভাইবোনেরা আর বিরক্তও হবে না, বাধাও দিবে না। যদিও আমি আম্মা কে নিয়ে অনেক রিস্ক নিয়েছি কারন আজ যদি তিনি সফল না হতেন তাহলে পুরো দোষটা আমার হতো। পুরো পরিবারের সামনে কাঠগোডায় দাঁড়াতে হতো আমার ।

আমার বিশ্বাস ছিলো আম্মার উপর। তিনি স্বপ্ন দেখতে জানেন এবং পরিশ্রমও করতে জানেন। আজ আমার থেকে বেশী আমার ভাই বোনেরা আম্মার সকল কামিয়াবিতে উৎসব করে আর আমি দুর থেকে তা উপভোগ করি, খুব ভালো লাগে, আত্নতৃপ্তি অনুভব করি।

আমার এখনো কষ্ট হয় ঐ বন্ধুটির মায়ের জন্য। সন্তানরা কোনো মায়ের স্বপ্ন পূরনে দায়িত্ব না নিক অন্তত তাদের স্বপ্ন না ভাংগুক, সেই অধিকার তাদের নাই। তাই বাঁধা দিয়ো না, বরংচ সেই বুড়ো মায়ের কড়া পিতা হও নিজেই। হাত ধরে সিড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাও দৃঢ়তার সাথে।
শুধু মা দিবস আসলেই কেক কাটবে, ছবি তুলবে আর তোমার নিজের স্বপ্নের গল্প গুলো মা কে বার বার শুনাবে এবং নিজের স্বপ্ন আর স্বার্থ পূরণে মায়ের সাহায্য নিবে – ব্যাস এই! আরে মা তো তোমার স্বপ্ন গুলোকেই তার জীবনের সেরা স্বপ্ন ভাবেই; তোমাকে নিয়েই তো তার সব, তাই বলে ১৬ আনার ১ আনাও তার নিজের একান্ত থাকতে পারে না?
আমার সন্তান আহনাফ আর আফশিনের কাছে আমার চাওয়া থাকবে আমি যদি বেঁচে না থাকি তোমার মা যদি বৃদ্ধ বয়সে কিছু করতে ইচ্ছা জাগে সেই ইচ্ছা গুলো আমলে নিও।

সন্তান ভুলে যায় এই মা একদিন তরুনী ছিলো, বেনী দুলিয়ে আনন্দে নেচেছিলো সারা ঘর, প্রেম ছিলো, ঠোঁটে গান লেগেছিলো। হয়তো এখন বয়সে বুড়ো কিন্তু মনের ভিতর ঢুকে দেখো তিনি স্বপ্ন এখনো দেখেন। নিজেকে শুধু সামলে রাখেন আর মন পাখিটারে বেঁধে ফেলেন বা মেরে ফেলেন।

আমি যখন আমার মাকে নিয়ে মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর ঘুরেছি দেখেছি তার মনের প্রশান্তি। কয়েকদফা মক্কা, মদিনায় গিয়েছি; দেখেছি এক অনাবিল তৃপ্তি তার মনে।
আমি আম্মাকে নিয়ে ঘুরেছি শিকাগোর অলি গলি, ফ্লোরিডার সমূদ্র সৈকতে, ডিজনি ওয়াল্টে আম্মা কে দেখেছি বাচ্চা দের মতো রাইডে উঠতে। আম্মাকে নিয়ে এতো ঘুরেছি তবুও মন ভরে নাই। এখনো স্বপ্ন দেখি আমার আম্মা কে নিয়ে ঘুরবো গোটা আমেরিকা, নিউইর্য়ক, ডালাস শহর, নায়াগ্রা ফলস, যাবো ম্যাক্সিকো, কানকুন, কিংবা কানাডা; আরো কতো কি ?
কারন আমার মন জানে আম্মা খুব ঘুরতে চান, খুব পৃথিবীটা দেখতে চান।

কখনো মা রা এগুলো বলবে না মুখ ফুটে এই স্বপ্নের কথা তবুও বুঝে নিতে হবে, তবেই মা দিবস ঘটাও করে উদযাপন অর্থবহ হবে – এসো আমরা মা দের প্রতিষ্ঠিত করি, শেষ বয়সে তাদের দায়িত্ব দেই সমাজ গড়ার – যেনো তাদের অবসর সময় গুলো সুন্দরভাবে কাটে।