“ভাষা থেকে স্বাধীনতা” মো: নজিবুর রহমান মিজান

প্রচ্ছদ শিক্ষাঙ্গন সাহিত্য ও দর্শন

এ বিশ্ব জগত নিয়ন্ত্রা স্রষ্টা রাবরুল মালিক আল্লাহ্ তার আশা আকাঙ্খাকে পরিপূর্নতা অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম আরশে মওলা হতে এ পৃথিবীকে, তথা পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, নদী-নালা, খাল-বিল তৈরী করেন, তার পরই নিজে উপাসক হয়ে উপাসনার জন্য অসংখ্যা মালায়িকা (ফেরেস্তা) সৃষ্টি করেন, তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে সেই স্রষ্টার উপাসনা বা ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করা। বিশ্ব নিয়ন্ত্রা হতে বিশ্ববক্ষে তারই বাঁণী সমূহ পৌছানোর জন্য আর এক বাহক হিসাবে জিবরাঈল (আঃ) কে সকল মালায়িকা বা দেবদূতের নেতা করে পাঠালেন, বটে সেই সকল দেবদূতের মাধ্যমে মহা প্রভুর আশা আকাঙ্খার অপূর্নতা থাকায় এ পৃথিবীর মিতৃকা হতে হযরত আদম (আঃ) কে এবং পরবর্তিতে হযরত মা হাওয়াকে সৃষ্টি করেন।

সারা বিশ্বের আদি মানব ও আদি নবী হযরত আদম (আঃ) কে তাঁর কৃত ভূলের শান্তিস্বরুপ মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ রাববুল মালিক স্বর্গধাম হতে মর্তধাম এশিয়া মহাদেশ সংলগ্ন ভারত বর্ষেরই সরনদ্বীপ বা স্বর্ণদ্বীপে স্বর্গচ্যুত হয়ে নেমে এসেছিলেন হযরত আদম (আঃ) সুগন্ধময় স্বর্গধাম থেকে সর্বপ্রথম ভারতে অবতরনের সময় তাঁর একহাতে এনেছিলেন হাজরে আসওয়াদ নামে প্রন্তর খন্ডটি যা অদ্যাবধি কাবাগৃহে সুসংরক্ষিত রয়েছে আর অন্য হাতে বহন করে এনেছিলেন নানা স্বর্গীয় নির্দশন হিসাবে বৃক্ষ তরুলতা আর সুস্বাদু ফলের বীজ ভান্ডার যা সারা বিশ্বকে ফলে ফুলে চমক লাগিয়ে দিয়েছে। মহান আল্লাহ্র শ্রেষ্টত্ব ঘোষনার সর্বপথ্র ম বানী ভাষারুপে ইসলামের মূল মন্ত্রের প্রথম ধ্বনি প্রতিধ্বনিত্ব হয়েছিল এই ভারত ভূমির হৃদয় মাঝে থাকা স্বর্ণদ্বীপে আযাণের ধ্বনির অনুরুপ চারবার আল্লাহু আকবর, দু’বার আশাহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাছুলুল্লাহ বাক্যগুলি ভাষার অন্তরালে সেদিন সেই ফেরেস্তার কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল। সেই ভাষার ধ্বনি বা বর্ণ থেকে শব্দ, আবার শব্দ থেকে বাক্যে, বাক্য থেকে বিভিন্ন কিতাব, পবিত্র কালাম গ্রন্থরাজী বই আকারে প্রকাশ পাইতে থাকে।

সেই ভাষার রুপ কখনো আরবী, বাংলা, হিন্দী, ইংরেজী, রোমান, ফারসী, উর্দ্দুতে রুপান্তরিত হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে দেশান্তরে বিস্তার লাভ করতে থাকে। আর সেই আল্লাহ্র পরিপূর্ণতা ও সান্নিধ্যে লাভের সুতীব্র, আকাঙ্খাটুকু বাস্তব সত্তার উপলদ্ধি একান্ত অনুভূতির মাধ্যমে সেই সৃষ্টিকর্তার অমিয় সুমুধুর বাঁণী হতে ভাষারুপে নানা জাতি, গোষ্ঠী, সমাজ ও দেশের মাঝে বিস্তৃতি লাভে আল্লাহ্ রাববুল মালিক আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) কে দান করেছিলেন। পরবর্তিতে সারা বিশ্বে প্রতিটি মানুষের অন্তরাত্মার নানা উৎসাহ ব্যঞ্জক বাঁণী ও চিন্তা-চেতনার জনশ্রুত ধ্বনি সমূহ বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে একেক্ বর্ণ হিসাবে ভাষা রুপেই দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দিয়েছে, আর একেকটি জাতির অমৃত ভাষারুপে পূর্ণ জাতীয়তা বোধে মানুষে মানুষে ঐক্যের বন্ধনে জন্ম দিয়েছে একটি জাতির ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একটি সমাজের আর সেই ভাষাকে আপন মহিমায় কেন্দ্র বিন্দু ভেবে হাজার হাজার, যুগ যুগ বছর ধরে কালের বির্বতনে একেকটি জাতির আত্বপরিচিতি হিসাবে জাতীয়তা বাদের আত্বচেতনা বোধ-জাগ্রত করেছে। যা একটি স্বাধীন বাংলাদেশের আস্তিত্ব ও আত্বস্বীকৃতি হিসাবে অমর ইতিহাস তৈরী করেছে।

আজ সেই থেকে শিক্ষা সাংস্কৃতি, সভ্যতা-কৃষ্টি, শিল্প-সাহিত্য জ্ঞান সাধনায় পূর্ণ চিন্তা চেতনাশক্তি বিভিন্ন ধর্মের সাথে ইসলামী নৈতিকতা নিয়ে জাতি ধর্ম-বর্ণ গোষ্ঠীর সম্মিলিত পরস্পর ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে উন্নয়নশীল পৃথিবীর দৃঢ় প্রত্যায়ে উন্নত জনপদও মানুষের কল্যানে সেদিন থেকেই শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ভাষা থেকেই জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি হয়ে থাকে, তাই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মূল আদর্শ হলো ভাষাভিত্তি¡ক পরস্পর সকল জাতিগুলোর মধ্যে সকল বিভেদ ত্যাগ করে মানব সেবা ধর্মের নামে মহা মানবদের পবিত্র আদর্শ ও সত্বাকে মানব ধর্মে পূর্ণ বিকশিত করা। সেই ভাষাকে মূল্যায়নে বাঙ্গালী জাতিকে মহিয়ান করে তুলে ছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে বাদ দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি যুদ্ধের কথা ভাবাই যায় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ধর্মীয় মতে ভাষার বিভিন্নতা থাকা সত্তে¡ও বাঙ্গালী আর বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করে একটি জাতি নিজ পরিচয়ে আত্বনির্ভরশীর হয়ে উঠে।

তারই একটি জাতির কাঙ্খীত দাবী রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই হিসাবে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের মর্যদা লাভ করে, আজ বাঙ্গালী জাতির উন্নয়নে পথে যাত্রা আরম্ভ হয়েছে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন হতে বাঙ্গালীরা যে আশায় স্বপ্ন দেখেছিল , সেই কাঙ্খিত স্বপ্ন ভেঙ্গেঁ চুরমার করে দেয় পাকিস্তানের স্বৈরাচারী ফিল্ড মার্শাল সামরিক শাসক চক্র। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গর্ভণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ সাহেব বাংলাকে তাদের উপনিবেশে পরিনত করার অভিপ্রায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দ্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষনা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম যাত্রা আরম্ভ হয়। আর এই ঘোষনার মূলে ছিল ধর্মের নামে বাঙ্গালী জাতিকে ধোকা আর প্রতারনা করা। যা বাঙ্গালী জাতির উপর উর্দ্দুভাষাকে জোড়পূর্বক চাপিয়ে দেওয়া। সেই হতে বাঙ্গালী জাতির শিক্ষা সাংস্কৃতি, ভাষা, প্রাচীন সভ্যতা ধারনকারী স্বাধীনতা আর জাতির মুক্তির এক দৃঢ় প্রত্যায়ে জাতির পিতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বলিষ্ঠ “না” ধ্বনি প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে চলার পথে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সহকর্মী বাঙ্গালী ছাত্রসহ কর্মীদের নিয়ে ভাষা আন্দোলনের যাত্রা আরম্ভ হয়।

আর এই ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের মূল ধারায় বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে আত্বদানে এক আধ্যাতিক চেতনা বোধ আত্বশক্তিতে জাগিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের চলমান ধারাবাহিকতায় জাতি-ধর্মের আত্বচেতনায় বলীয়ান হয়ে স্বাধীনতা আর মুক্তি যুদ্ধের এক দৃঢ় প্রত্যায়ে আল্লাহ্ ও রাসুলের প্রতি পূর্ন আস্থা রেখে জাতির বীর সন্তানেরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে শাহাদতের অমৃত আশায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সম্মুখ সমরে ও গরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর নয়মাসজীবন মরন যুদ্ধে অনেক বাঙ্গালীর জীবন, রক্তের ও বাঙ্গালী মা-বোনদের তথা নারীদের ইজ্জত, সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে জন্মগ্রহন করল স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্রের।
লেখক, মো: নজিবুর রহমান মিজান