গার্মেন্টস স্ক্রীন প্রিন্টিং শিল্পটি ক্রমাগত নিগ্রহের শিকার। মনিরুজ্জামান মনির

অর্থনীতি

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে স্ক্রীন প্রিন্টিং শিল্পের বিশেষ অবদান সত্ত্বেও এ শিল্পটি ক্রমাগত নিগ্রহের শিকার।

রপ্তানি পোশাককে আমরা সাধারণত তিনটি শ্রেণীতে দেখতে পাই তা হলো নীট, ওভেন, সোয়েটার I তিনটি শ্রেণীতই স্ক্রীন প্রিন্টিং পোশাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ I ওভেন ও সোয়েটার তৈরিতে স্ক্রীন প্রিন্টিংয়ের ব্যবহার কম হলেও নীটের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ৯৫-১০০% I মূলত নীট পোশাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্ক্রীন প্রিন্টিং I পৃথিবীর সব চেয়ে বড় বড় নীট লাইসেন্স ক্রেতাগণ মূলত প্রিন্টিংকেই প্রাধান্য ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন I টি-শার্ট, পলো-শার্ট, বিভিন্ন টপস বটমসে বাহারি রংয়ের প্রিন্টিং পোশাকটিকে আকর্ষণীয় করে তুলে এককথায় ভালো মানের প্রিন্টিং ক্রেতাকে পন্যটি ক্রয়ে ব্যাপক ভাবে আকৃষ্ট করে এবং ক্রেতার চাহিদা পূরনে সক্ষম করে তুলে I

বাংলাদেশে বেশির ভাগ পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানেই কম্পোজিট নয় এমন কি অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামের অংশে কম্পোজিট লেখা থাকলেও বাস্তবে তা খুঁজে পাওয়া যায়না I একটি পরিপূর্ণ কম্পোজিট প্রতিষ্ঠানে স্পিনিং, নিটিং, ডায়িং, প্রিন্টিং, এমবয়ডারী, কাটিং, সুয়িং, ফিনিশিং এক্সেসরিজ সহ পোশাক তৈরিতে যা যা প্রয়োজন তার সকল সুবিধা অন্তর্নিহিত থাকবে কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, পোশাক তৈরির বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানেই পৃথক ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে I সুয়িং প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রেতাদের থেকে সরাসরি বা এজেন্টের মাধ্যমে অর্ডার সংগ্রহ করে বলে তারা অঘোষিত ভাবে অন্যান্য সকল সেক্টরের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে I তাদের রয়েছে শক্তিশালী সংগঠন বিজিএমইএ I বিজিএমইএর মাধ্যমে সরকার ও ক্রেতার সাথে দর কষাকষি করে তাদের সর্বোচ্চ ব্যবসায়ীক সুবিধাটুকু আদায় করে নিতে পারছে কিন্তু তাদের সহযোগী অন্যান্য সেক্টরগুলি মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারছে না I

সুয়িং সেক্টরের পর বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যে অংশটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যাপক ভাবে সহয়তা করছে তা হলো স্ক্রীন প্রিন্টিং I পোশাক রপ্তানীর প্রয়োজনেই ঢাকা, চট্রগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট, বড় আকারে এ শিল্পটি গড়ে উঠেছে I শক্তিশালী সংগঠনের অভাবে এর সঠিক সংখ্যা নির্ণয় সম্ভব না হলেও সার্বিক বিবেচনায় ৮-১০ হাজার স্ক্রীন প্রিন্টিং শিল্প প্রতিষ্ঠান চলমান অবস্থায় রয়েছে যার শ্রমিক কর্মচারীর সংখ্যা অনুমানিক প্রায় ৮-১০ লাখ I তৈরি পোশাক রপ্তানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এ শিল্পটি সকল মহলের বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়েছে I  সকল মহল বলতে বায়িং হাউজ, সুয়িং গার্মেন্টস সেক্টর, ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় I নিম্নে আমি সকল মহলের বৈষম্যের চুম্বক অংশটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করছি –

বায়িং হাউজঃ আল্টিমেট কাস্টমারের সাথে নেগোশিয়েশন করে তারা তৈরি পোশাকের অর্ডার সংগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তাদের ডেভেলপমেন্টস গুলিতে ব্যাপক ভাবে সহয়তা করে বিভিন্ন স্ক্রীন প্রিন্টিং শিল্প প্রতিষ্ঠানI  যতবার দরকার যত ধরনের পরিবর্তনেই থাকুকনা কেন একটি পারফেক্ট  অ্যাপ্রভাল পর্যন্ত স্ক্রীন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান নিজের টাকা ও শ্রম দিয়ে নিরলস কাজ করে যায়I অ্যাপ্রভালের পরেই অনেক ক্ষেত্রে প্রিন্টিং এর দাম কমানোর ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করে I অনেকেই বাধ্য হয়েই কম দামে কাজ করতে রাজী হন বা কাজ ফেলে ফিরে যান I আবার অনেক বায়িং হাউজ গুলি অ্যাপ্রভাল শেষে সুয়িং গার্মেন্টসের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন বা উচ্চ হার বাধ্যতামূলক ভাবে কমিশন বসিয়ে দেন I তাদের নিকট থেকে ডেভেলপমেন্টের খরচ আদায় করতে কষ্ট হয় I ব্যবসার স্বার্থে নিরুপায় হয়ে সব সহ্য করতে হয় I

সুইং গার্মেন্টস সেক্টরঃ সুইং সেক্টর থেকে মূলত স্ক্রীন প্রিন্টিংয়ের অর্ডার গুলি বেশি আসে যাদের কে আমরা মূল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি হিসাবে চিনি I অর্ডার গুলি নিয়ে মূলত ফ্যাক্টরির মিড ম্যানেজমেন্ট বা মার্চেন্টডাইজিং সেকশনের সাথে কাজ করতে হয় I এখানেও বায়িং হাউজের মতোই ডেভেলপমেন্টস দিয়ে শুরু হয়, অ্যাপ্রভাল পর্যন্ত টাকা ও শ্রম দিয়ে নিরলস কাজ করতে হয় I অ্যাপ্রভালের পরেই শুরু হয় দাম কমানোর ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি, এই সেক্টরের মিড ম্যানেজমেন্টের কমিশন বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেক্ট I মার্চেন্টডাইজিং সেকশনে যারা অর্ডার বন্টনের দায়িত্বে থাকেন তারা অনেক ক্ষেত্রে ৫-৪০%পর্যন্ত কমিশন আদায় করে বসেন, এদের অসহনীয় যন্ত্রণায় অনেক স্ক্রীন প্রিন্টিং ফেক্টরী বন্ধ হয়ে গেছে, প্রশ্ন আসতে পারে কমিশন দেন কেন বা টপ ম্যানেজমেন্টের নিকট অভিযোগ করছেন না কেন উত্তর হলো কোন লাভ নেই বরং নিজের ব্যবসায়ীক স্বার্থেই নিরব থাকাই উত্তম I এর জন্য দায়ী বলা যায় টপ ম্যানেজমেন্টের উদাসীনতা তবে এদের মধ্যেও অনেক ভালো মানের মার্চেন্টডাইজার ও গার্মেন্টস ফেক্টরী রয়েছে যাদের সাথে সবাই কাজ করার সুজোগ পায় না I সুইং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ কনফার্ম হলে ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যুতে দীর্ঘসূত্রতা, বি.বি এলসি, একসেপ্টটেন্স, পেমেন্ট নিয়ে জটিলতা অহরহ ঘটনা I এমনি কি কাজ শেষে পেমেন্ট পাওয়া যায়না এটাও অহরহ ঘটছে I বলা যেতে পারে সুয়িং সেক্টরের সব চেয়ে নিগ্রহের শিকার প্রিন্টিং সেক্টর I এর থেকে উত্তরণ জরুরী I

ব্যাংকঃ স্ক্রীন প্রিন্টিং শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক গুলোর তেমন ইনভেস্ট নেই বললেই চলে তবে তারা বিবি এলসি গুলি পারচেজ করে নির্দিষ্ট সময়ে জন্য ঋণ প্রদান করে I এক্ষেত্র্রে বিবিএলসি ইস্যুকৃত ব্যাংক গুলো তাদের গ্রাহক সুইং গার্মেন্টস সেক্টরের কথা মতো কাজ করে I একসেপ্টটেন্স, পেমেন্ট নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে I পেমেন্ট ওভারডিউ হয়ে গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের  নিয়মনীতি অনুসরণ না করে নিজের গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করে এজন্য ওভারডিউ ইন্টারেস্ট সম্পূর্ণ ভাবে স্ক্রীন প্রিন্টিং ফ্যাক্টরী বহন করতে হয় I তাছাড়া ইস্যুকৃত ডিডি বা পে-অর্ডার ক্যাশ হতে তিন থেকে চার কর্ম দিবস প্রয়োজন হয় এসময় কালের ইন্টারেস্টও স্ক্রীন প্রিন্টিং ফ্যাক্টরীর বহন করতে হয়I এর থেকেও উত্তরণ জরুরী I

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ঃ স্ক্রীন প্রিন্টিং সেক্টরে লাখ লাখ বা মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করে এবং তৈরি পোশাক রপ্তানীতে ব্যাপক অবদান রাখছে এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হয়তো ওয়াকিবহাল নয় বা ওয়াকিবহাল থাকলেও সুয়িং গার্মেন্টস সেক্টরের সাথে গুলিয়ে ফেলেন তাই সরকারি কোন প্রণোদনা এখন পর্যন্ত এ সেক্টরে এসে পৌঁছায়নি I শক্তিশালী সংগঠনের অভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারের উচ্চ মহলের সাথে স্ক্রীন প্রিন্টিং সেক্টরের প্রতিনিধিদের বসারও সুজোগ হয়নি I

সকল প্রকার নিগ্রহ থেকে মুক্তির সমাধান হচ্ছে নিজেদের একটি শক্তিশালী সংগঠন I বাস্তবতা উপলব্ধি করে বিভিন্ন স্ক্রীন প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারী প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ ইতিমধ্যেই একটি শক্তিশালী সংগঠনের গড়ার লক্ষে আলাপ আলোচনা শুরু করেছেন যা অচিরেই বাস্তবে রূপ নেবে বলে বিশ্বাস করি I গার্মেন্টস স্ক্রীন প্রিন্টিং সেক্টরও মাথা তুলে দাঁড়াবে তাদের মর্যাদাই বলে দিবে এ সেক্টর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানে দেশকে কিভাবে সহযোগিতা করছে I সরকারও এটা নিশ্চিত করবে যে, গার্মেন্টস স্ক্রীন প্রিন্টিং সেক্টরেও লাখ লাখ শ্রমিক কর্মচারী আছে তারাও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দেশকে সহযোগিতা করছে অতএব তাদেরও আপদকালীন প্রণোদনা প্রয়োজন I

লেখক :
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ডিজনি কালার লিমিটেড
email : monir3011@gmail.com