অসহায়ত্ব ও করোনার দংশন। _মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির

সাহিত্য ও দর্শন

গল্ল|সাহিত্য|

সাজ্জাদ তাহির অ্যাকাউন্টিং-এ মাস্টার্স, গত দশ বছর জব করছে একটি বিদেশি সংস্থার হিসাব বিভাগে I বসবাস রাজধানীর মোহাম্মদপুরে I স্ত্রী আয়েশা খানমও পলিটিক্যাল সাইন্সে মাস্টার্স I সেও জব করতো এক মাধ্যমিক স্কুলে I প্রথম সন্তানের জন্মের সময় স্বাস্থ্যগত ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি বিবেচনায় ডিউটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলনা বিধায় তার প্রিয় স্কুলের জবটি ছাড়তে হয়েছিল I আজ তাদের সংসারে ফুটফুটে দুটি সন্তান সাহাবী (৮) ও সোহানী (৩) I সাহাবী বাসার পাশেই ভালো মানের একটি স্কুলের ২য় শ্রেণির ছাত্র I সোহানীকেও তারা আগামীতে স্কুলে দেয়ার কথা ভাবছে I আয়েশা খানম ছেলের স্কুলের ডিউটি, সাথে মেয়ের দেখাশুনা, তার উপর সংসারের কাজ কর্ম নিয়ে ভালোই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে I চার জনের ভালোবাসার সংসারে সুখের যেন কমতি নেই I

সংসার খরচের পর বাড়তি টাকাটা জমিয়ে তাদের হাতে একটি ভালো সঞ্চয় হয়ে গেছে I বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এক ডেভেলপার কোম্পানির কাছে মাঝারি আয়তনের একটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছে I কোম্পানিরটি বলে দিয়েছে যে, যত তাড়াতাড়ি কিস্তি পরিশোধ করবে তত তাড়াতাড়ি তারা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিবে I সাজ্জাদ-আয়েশার পরিবারে আনন্দের ছোঁয়ার খেলা করছে এর মাঝেই দ্রুত সব কিস্তি পরিশোধের টেনশন ! জব থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ অনেকটা সময় সাপেক্ষ হবে I তাই সাজ্জাদ তার পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি জমি বিক্রি করে দিলো, সাথে আয়েশা খানমের বাবাও যথাসাধ্য সাহায্য করলেন I ভালো অংকের কিছু টাকা কোম্পানিটিকে অলরিডি দিয়ে জমা দেয়া হয়ে গেছে I আগামি এক বছর জব থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে সকল কিস্তি পরিশোধের একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে I তাদের মাথায় এখন শুধু একটাই ভাবনা, কষ্ট হলেও যত দ্রুত সম্ভব কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হবেI পুরো পরিবার নিজেদের ফ্ল্যাটে উঠার স্বপ্ন সুখের এক উত্তেজনায় ভাসছে I

জুন ২০১৯, হঠাৎ মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল I সাজ্জাদ তাহিরের কর্মস্থল বিদেশি সংস্থাটি তাদের কন্ট্রাক্ট এক্সটেনশন না হওয়াই আর বাংলাদেশে কন্টিনিউ করছে না I আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে অফিস ক্লোজ করে তারা ফিরে যাচ্ছে I অফিসে কর্মরত সকলকে কর্ম খুঁজতে নির্দেশ দেয়া হলো I সাজ্জাদ-আয়েশার পরিবারে বিষাদের ছায়া নেমে এলো I সাজ্জাদ তাহির দুশ্চিন্তায় ভেঙ্গে পড়লো I স্ত্রী আয়েশা খানম দুশ্চিন্তার মাঝেও স্বামীকে সাহস, উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে – ভেঙ্গে পড়োনা, দেখো, তুমি এর চেয়েও ভাল জব পাবে I সাজ্জাদ নতুন জবের সন্ধানে বিভিন্ন অফিসে সিভি ড্রপ করতে শুরু করলো কিন্তু, তেমন কোন সাড়া পেলো না I

অক্টোবরে যথারীতি জবলেস হয়ে ঘরে ফিরলো সাজ্জাদ I একটি জবের সন্ধানে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করলো I আত্মীয়-স্বজন পরিচিত সবার কাছে কাকুতি-মিনতি করে চলেছে I এদিকে নভেম্বরে ফ্ল্যাটের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেন সাজ্জাদ, হাতের সব জমাকৃত অর্থ শেষ হয়ে গেল, এখনো জবের কোন সন্ধান মেলেনি I

জানুয়ারি ২০২০, সাহাবী কৃতিত্বের সাথে ৩য় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে I নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাহাবীকে স্কুলে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হলেন সাজ্জাদ-আয়েশা পরিবার I নিকট আত্মীয় ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় বিলম্ব ফি দিয়ে ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি হলো সাহাবী I কিন্তু সোহানীকে স্কুলে ভর্তি করানোর আশা পূর্ণ হলো না I

জানুয়ারিতেই প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় একটি পরিবারের দুটি বাচ্চাকে পড়ানোর কাজ পায় আয়েশা I সাজ্জাদ হন্যে হয়ে ঘুরছে একটি জবের আশায়I ইতোমধ্যে ডেভেলপার কোম্পানি নোটিশ পাঠিয়েছে অনাদায়ী কিস্তি পরিশোধের I সাজ্জাদ-আয়েশা পরিবার ফ্ল্যাটের বুকিং ক্যানসেল করে টাকা ফেরত চান I কিন্তু কোম্পানিটি এভাবে টাকা ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে I ফ্ল্যাটটি অন্য কারো কাছে বিক্রি হলেই তারা টাকা ফেরত পেতে পারে I সময় যাচ্ছে , সব অসহায়ত্ব তাদের ঘিরে ধরেছে I আয়েশার চোখের কোনে এখন আর পানি জমছে না, সাজ্জাদ কেমন জানি অসুস্থ হয়ে পড়ছে I বাচ্চা দুটোর দিকে তাকানোই যাচ্ছেনা, খেয়ে না খেয়ে অর্ধহারে অনাহারে কাটছে দিন I

মার্চে অনেক কষ্টে এক প্রতিবেশীর সহায়তায় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে স্বল্প বেতনের জব পেল সাজ্জাদ I তিন মাসের বাড়িভাড়া, দোকান বাকী সব মিটিয়ে দিতে হবে তাড়াতাড়ি I সাজ্জাদ অসুস্থ শরীরে প্রাণপণ চেষ্টা করছে ডিউটি চালিয়ে নিতে I শত কষ্টের মাঝেও একটু শান্তির আভাস দেখছে আয়েশা I ভাবছে, খুব শীঘ্রই এ ফ্ল্যাট বাড়িটি ছেড়ে কম পয়সার একটি রুম ভাড়া করবে, ছোট সংসার চলে যাবে কোন রকম ভাবে I

সারা বিশ্বের মতো করোনা আতঙ্কে বাংলাদেশ I ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এ রোগ ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে I খোদ রাজাধানীতেই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে I বিশেষজ্ঞদের মতে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে এ ভাইরাস ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়বেI তাই সকলকে হোমকোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে, ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না I যথারীতি সরকারি ঘোষণা আসলো সকলের সাথে মার্চ ২৫ থেকে সাজ্জাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীও অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল I

এপ্রিল ৫, সাজ্জাদের পরিবারে খাবার নেই দুদিন চলছে I মোড়ের দোকান থেকে তিন দিন আগে নিয়ে আসা সামান্য কিছু বিস্কিট আছে ঘরে I বাচ্চারা এগুলো আর খেতে চাইছেনা, ভাত খাওয়ার জন্য কান্না করছে I বাইরে পুলিশ, মিলিটারি, দোকানপাট সব বন্ধ I মোড়ের দোকান খোলা থাকলে না হয় হাতে পায়ে ধরে হলেও কিছু করা যেত এখন এ সুযোগটিও নেই I প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধার-দেনা করতে করতে এখন আর হাত পাতার মতো অবস্থা নেই I সাজ্জাদ ডিসিশান নেয় যত বিপদ আসুক সে বাইরে বের হবেই, কল্যাণপুরে এক পরিচিত বড় ভাই আছে তার কাছ থেকে কিছু টাকা ধারে আনার চেষ্টা চালাবে, বাঁচাতে হবে বাচ্চা দুটোকে I

রাস্তার ফুটপাত ধরে হাটছে ক্লান্ত রোগাগ্রস্ত সাজ্জাদ,পা যেন আর চলছেনা ! তবু চলছে, তাকে যেতেই হবে I সাজ্জাদ হঠাৎ খেয়াল করলো শ্যামলীর মাঝ পথে গলির দিকে কিছু মানুষের হট্টগোল, এগিয়ে গেল সে, দেখতে পেল কোন এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গরিব, অসহায়দের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছে I সাজ্জাদ ভুলে গেল কল্যাণপুরে যাওয়ার কথা, সে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল I সময় যাচ্ছে, ইতোমধ্যে একজন এসে রোগাগ্রস্ত সাজ্জাদকে নেশাখোর বলে সন্দেহ করলো I সে চাল, ডাল বিক্রি করে নেশা করবে এমন অপবাদ দিয়ে লাইন ছাড়তে বললো I অনেকেই এতে সায় দিল, তাকে লাইন থেকে বের করে দেয়া হলো I সাজ্জাদ এক স্বেচ্ছাসেবীর পায়ে পরে কান্না শুরু করলে তিনি দয়া করে আবার লাইন ধরতে বললেন I সে তাই করলো কিন্তু লাইন এতক্ষণে বহুদূর চলে গেছে I পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে সাজ্জাদের ভাগ্যে খাদ্যসামগ্রী জুটলো না I কি করবে অসহায় মানুষটি ! ভাবছে ব্যর্থ পিতৃত্বের দায় ভার নিয়ে সে আর ঘরে ফিরে যাবে না I কিন্তু তাকে ঘরে ফিরতেই হবে তার জন্যে যে অপেক্ষা করছে ক্ষুধার্ত মাছুম বাচ্চারা, প্রিয়তমা স্ত্রী I

কলিং বেলের আওয়াজে বাচ্চারা খুশি হয়ে উঠলো, এই বুঝি বাবা খাবার নিয়ে এলো I আয়েশা দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল, না সাজ্জাদ ফিরেনি এসেছে বাড়িওয়ালী I বাড়িওয়ালী রাগী মেজাজে ঘরে ঢুকে বললো আপনারা তিন মাসের বাড়িভাড়া দিচ্ছেন না, দয়া করে বাড়িটি ছেড়ে দেন I কোন উত্তর আসছেনা আয়েশা থেকে, কি বলবে সে ! শুধু অসহায় চোখে চেয়ে সব শুনে যাচ্ছে I বাড়িওয়ালী এক পর্যায়ে বাচ্চাদের কাছে জানতে চাইলো তোমাদের বাবা কোথায়? উত্তরে ছোট্ট সোহানী বললো বাবা আমাদের জন্য ভাত আনতে গেছে, আমরাতো কদিন ধরে খাইনা I বাড়িওয়ালী মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেলেন, বাচ্চা দুটোকে ঝাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো আয়েশা চোখ মুছতে মুছতে রুমের ভেতরে ঢুকে গেল I বাড়িওয়ালী দৌঁড়ে গিয়ে তার বাসায় যা খাবার পেল নিয়ে সব এলেন, সাথে কিছু চাল, ডাল I নিজ হাতে বাচ্চা দুটোকে খাওয়ালেন I যাওয়ার আগে এক মাসের ভাড়া মওকুফের মেসেজ দিয়ে গেলেন I

আয়েশা স্বামীর ঘরে ফেরার অপেক্ষা করতে থাকলো, তারা যে আজ ভাত খাবে এক সাথে বসে I আয়েশার চোখে আনন্দ অশ্রু, বাচ্চারাও মহাখুশি I সাজ্জাদ ঘরে ফিরলো এক অসহায় ক্লান্ত পিতা I বাচ্চারা দৌঁড়ে গিয়ে বাবাকে ঝাপটে ধরলো I পরিবারে হাসি খুশি পরিবেশ দেখে সে অপলক তাকিয়ে রইলো I তখন তার প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা তাকে ভয়াল করোনার মাঝে বাড়িওয়ালীর করুণার গল্প শুনালো I

(চরিত্র, স্থান, কাল সর্বপোরি গল্পটি – কাল্পনিক)

— 0 —